মালয়েশিয়ায় রিলোকেশন ৩ - শেষ মুহুর্তের প্রস্তুতি

প্রিয় পাঠক, ধরে নিচ্ছি আপনার হাতে মালয়েশিয়ায় সিংগেল এন্ট্রি ভিসা রয়েছে। সাধারণত এই ভিসার মেয়াদ থাকে ৯০ দিন। অর্থাৎ আগামী ৩ মাসের মাঝে আপনাকে মালয়োশিয়া যেতে হবে। আপনার কোম্পানির HR এর সাথে যোগাযোগ করে জানিয়ে দিন আপনি কবে এনট্রি করবেন এবং কবে জয়েন করবেন। কেননা সেই অনুযায়ী আপনার থাকার ব্যাবস্থা করা হবে। সেই সাথে যত দ্রুত জয়েন করবেন, সেলারীও তত বেশী পাবেন। তবে মালয়েশিয়া পৌঁছে মিনিমাম ২-৩ দিন হাতে রাখা ভাল, কারণ নতুন জায়গায় গিয়ে রেস্টুরেন্ট চিনতে ও জরুরী জিনিসপত্র কিনতে আপনার সময় লাগবে। তাছাড়া মালয়েশিয়ায় বেশীরভাগ জায়গায়গ মাসের ২৫ তারিখে সেলারী দেওয়া হয়। সুতরাং আপনি ২০ বা ২২ তারিখে জয়েন করলে পরের মাসে বেতন পাবেন। সুতরাং সবদিক বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিন কবে যেতে চান।

ফ্লাইট বুকিং

মালয়েশিয়ায় শুধুমাত্র বিমানে যাওয়া যায় (ইমিগ্রেশনের জন্য)। সুতরাং আপনাকে ভিসা পাওয়া মাত্র সবার আগে বিমানের টিকেট কাটতে হবে। ঢাকা থেকে বিমান বাংলাদেশ, মালিন্দো এয়ার, এয়ার এশিয়া, ইউএসবাংলা এয়ারলাইন্স, মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্স ইত্যাদি এয়ারলাইন্স মালয়েশিয়ায় যায়। টিকেটের প্রাইস অনুযায়ী সুবিধামত টিকেট করে ফেলুন। যদি আপনার কোম্পানি আপনার ট্রাভেল এক্সপেন্সেস বহন করে, তাহলে টিকেট নিজেই অনলাইনে কাটতে পারেন। কেননা ট্রাভেল ইটিনারির কপি আপনার পরবর্তীতে ক্লেইম করার জন্য দরকার হবে। আর মালয়েশিয়ান ইমিগ্রেশনের ঝামেলা সহজে পার হতে চাইলে মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্স বা জনপ্রিয় কোন এয়ারলাইন্সের টিকেট কাটতে পারেন। এতে অযাচিত প্রশ্নবাণ থেকে মুক্তি পেতেও পারেন।

ঢাকা থেকে মালয়েশিয়া যেতে সময় লাগে প্রায় ৪ ঘন্টা। আর মালয়েশিয়ার টাইমজোন UTC+8. যদি আপনি মালয়েশিয়ায় গিয়ে সরাসরি হোটেলে উঠতে চান, তাহলে বাংলাদেশ সময় ভোরে বা সকাল ৮-৯টার দিকে টিকেট কাটতে পারেন। তাহলে দুপুর ১২টার দিকে মালয়েশিয়া পৌঁছে চেকইন করতে পারবেন। যদি আপনার বাসা ভাড়া নেওয়া থাকে, এবং সরাসরি বাসায় উঠতে চান, অথবা কোন আত্মীয়দের বাসায় উঠতে চান, তাহলে মালয়েশিয়ায় কখন পৌঁছাবেন সেটা বিবেচনা করে নিন। কেননা মাঝরাতে আপনি খুব বেশী গাড়ি, খাবারের রেস্টুরেন্ট খোলা পাবেন না। তবে এয়ারপোর্টে রাতের বেলায় পৌঁছালে ভীড় বেশ কম থাকে। যেহেতু ফ্লাইটের পুরা সময়টা একটু লম্বা, আপনার পায়ের সমস্যা বা হাঁটুর সমস্যা থাকলে Extra Legroom সহ সিট বুক করতে পারেন। ফলে বিমানে পায়ের কাছে বেশী জায়গা থাকবে ও একটুপরপর পা সোজা করতে পারবেন। চাইলে বিজনেস ক্লাসও কেটে ফেলতে পারেন।

কেনাকাটা

বিদেশ যাওয়ার আগে সবাইই বেশ কিছু কেনাকাটা করে থাকে। আপনিও নিশ্চয়ই ব্যাতিক্রম হতে চান না। এবার কিছু টিপস দেই কি কি কিনবেন।

উপরে যা যা বললাম এগুলা (ছাতা, ড্রেস বাদে) কোনভাবেই কেবিন ব্যাগ (যেটা বিমানের সিটের উপরের বাংকারে রাখা যায়) এ নেওয়া যাবেনা। এগুলা অবশ্যই চেকড ব্যাগে (যেটা কার্গো হিসেবে যায়) দিতে হবে। কেবিন ব্যাগে কোনভাবেই ধারাল কিছু (চামচ, কলম, রেজর ইত্যাদি) নেওয়া যাবেনা। এমনকি ভর্তি পানির বোতলও নয়। আর সবকিছু লাগেজে নেওয়ার পর ওজন করে নিন। কেননা ওভারওয়েট হলে প্রতি কেজি ১০০০-২০০০ টাকা করে ফি দিতে হবে যা খুবই বেশী। সাধারণত চেকড ব্যাগ হিসেবে ৩০-৪০ কেজি আর কেবিন ব্যাগ হিসেবে ৭-১০ কেজি নেওয়া যায়। অনেক এয়ারলাইন্সে ২-৩ টির বেশী ব্যাগ নেওয়া যায়না। আপনার আপনার ফ্লাইট টিকেট থেকে বা কাস্টমার কেয়ার থেকে ডিটেইলস জেনে নিন।

টেকনিকাল ব্যাপার

মালয়েশিয়ায় যাবার পূর্বে ফোনে নিচের এপ গুলো ইন্সটল করে নিন। তাহলে ওখানে গিয়ে সুবিধা পাবেন।

যারা বিদেশ থেকে বাংলাদেশে সরাসরি মোবাইল নম্বরে কল দিতে চান (ফিচার ফোন ইউজার), তাদের জন্য Skype দিয়ে ৩ টাকা রেটে প্রতি মিনিট কথা বলতে পারেন। এটা ইউজ করার জন্য আপনি যাকে ফোন করবেন তার স্মার্টফোন থাকার প্রয়োজন নেই। জাস্ট রওনা দেওয়ার পূর্বে ক্রেডিট কার্ড দিয়ে আপনার স্কাইপ একাউন্টে ৫ ডলার রিচার্জ করে নিন। এয়ারপোর্টে নেমে ফ্রি ওয়াইফাই দিয়ে আপনি যেকোন নম্বরে ১৫০-২০০ মিনিট কথা বলতে পারবেন।

আর্থিক প্রস্তুতি

মালয়েশিয়া এসে প্রথম মাস আপনাকে নিজ খরচে চলতে হবে কেননা সেলারী আপনি মাসের শেষে পাবেন। এমনকি PayDay এর আগে জয়েন করলেও ওই মাসের সেলারী পরের মাসে পাবার কথা। সুতরাং যথেষ্ট আর্থিক প্রস্তুতি নিয়ে আসা ভাল হবে। তার উপর এখানে এসেই শুরুতে আপনাকে নতুন অনেককিছু কিনতে হবে। যেমন নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস, খাবার, রান্নার জিনিসপত্র, বালিশ-চাদর-কাঁথা ইত্যাদি। দেশ থেকে অনেক কিছুই কিনে আনতে পারেন যদি লাগেজ ওয়েট লিমিট ক্রস না করে। নইলে এখানে এসে কিনতে হবে।

এর সাথে নিচের বিষয়গুলি বিবেচনা করুন।

উপরের সবকিছু যাচাই করে হিসাব করে নিন আপনার কত খরচ হতে পারে এবং সেই পরিমাণ টাকা রিংগিত বা ডলারে কনভার্ট করে নিয়ে আসুন। এয়ারপোর্টে হ্যারাজমেন্ট থেকে বাঁচতে সোনালী ব্যাংক বা যেকোন বেসরকারী ব্যাংক থেকে কারেন্সি কনভার্ট করে পাসপোর্টে সীলসহ এনডোর্স করে নিন। ডলার করার চেয়ে সরাসরি রিংগিত করে আনতে পারেন। তাহলে মালয়েশিয়া এসে কনভার্ট করার ঝামেলা থেকে বেঁচে যাবেন। সেই সাথে আসার সাথে সাথেই জিনিসপত্র কেনাকাটা, সিমকার্ড কেনা ইত্যাদি করতে পারবেন। আর আপনার যদি বাংলাদেশী ক্রেডিট কার্ড থাকে, তাহলে পাসপোর্টে ১০০০-২০০০ ডলার এনডোর্স করে কারেন্সি কনভার্ট করে রাখতে পারেন। তাহলে মালয়েশিয়া এসে বিভিন্ন ডিজিটাল সার্ভিস (ফোন রিচার্জ, গ্র্যাবের বিল দেওয়া, নেটফ্লিক্সের বিল দেওয়া) ইত্যাদি করতে পারবেন।

কাগজপত্রের প্রস্তুতি

আমি বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়া প্রবেশ পর্যন্ত কোন কাগজ প্রিন্ট করিনি। সবখানে সফট কপি (মোবাইলে পিডিএফ) দিয়ে কাজ চালিয়েছি। তবে আপনি চাইলে সবগুলার এককপি করে প্রিন্ট রাখতে পারেন। আটকে গেলে কাজে লাগবে। লিস্ট করে নিন কি কি নেওয়া উচিত।

এছাড়া নিচের জিনিসগুলো হাতের কাছে রাখতে পারেন (লিখিত বা ডিজিটাল ফর্ম)

ডিজিটাল প্রস্তুতি

যেহেতু দেশের বাইরে আসছেন, কাজেই আপনার সিম কার্ড এখানে কাজ করবেনা এটাই স্বাভাবিক। তাই নিচের জিনিসগুলো আরেকবার চেক করে নিন।

অনেক জ্ঞান দিয়ে ফেললাম। আপাতত এই পর্যন্তই। আরো কিছু মাথায় আসলে এড করে দিব। আপনারাও চাইলে সাজেশন দিতে পারেন কি কি করা উচিত। শুভকামনা রইল!