মালয়েশিয়ায় রিলোকেশন ৪ - ইমিগ্রেশন

মালয়েশিয়ান ভিসা পাওয়া ও কেনাকাটা শেষে এবার আকাশে উড়াল দেবার পালা। আগের পর্বেই ফ্লাইট বুকিং সম্পর্কে বলেছিলাম। এই পর্বে লিখব কিভাবে বিখ্যাত মালয়েশিয়ান ইমিগ্রেশন পার হবেন।

চেকইন ও ফ্লাইট

যারা নিয়মিত বিমানে ভ্রমণ করেন তাদের জন্য নতুন করে কিছু বলার নেই। তবে যারা প্রথমবারের মত যাচ্ছেন, তাদের জন্য কিছু টিপস দেওয়া যেতে পারে। প্রথমত আপনার এয়ারলাইন্সের টার্মস এন্ড কন্ডিশনস বুঝে নিন। সেই সাথে লাগেজ পলিসি, নিষিদ্ধ আইটেমের লিস্ট জেনে নিন। চেকইন কাউন্টার কখন খুলে, সিট সিলেকশন আছে কিনা এসবও আগে থেকে ক্লিয়ার হয়ে নিতে পারেন। ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইটের জন্য মিনিমাম ৩-৪ ঘন্টা আগে এয়ারপোর্ট পৌঁছান ভাল। এর সাথে ঢাকার রাস্তার জ্যাম এড করে নিন। এয়ারপোর্টে পৌঁছে টার্মিনালে ঢুকতেও লম্বা লাইন থাকে অনেক সময়। চেকইন কাউন্টারেও লাইন থাকে প্রায়ই। এজন্য হাতে কয়েক ঘন্টা বাড়তি সময় রাখা বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

আর বাংলাদেশের ইমিগ্রেশনে বেশ সময় লাগে। আছে ডিপার্চার কার্ড পূরণের ঝামেলা। ডিপার্চার কার্ড পূরণ করতে আপনার (ও সাথের সকল যাত্রীর) নাম ধাম সহ সকল তথ্য, পাসপোর্ট নম্বর, যে দেশে যাবেন সেখানকার এয়ারপোর্টের নাম, আপনার ভিসা নম্বর (পাসপোর্টে আছে) ইত্যাদি লাগে। আর হ্যা, সাথে করে একটা কলম নিয়ে যাবেন। আমি প্রবাসী কল্যান ডেস্ক, ইমিগ্রেশন এনট্রি, চেকইন কাউন্টারে খুজে কলম পাইনি। পরে বেশী দাম দিয়ে কিনতে হইছে। কলমটা পরে চেকড ব্যাগে দিয়ে দিতে পারেন কেননা কেবিন ব্যাগে কলমজাতীয় শার্প জিনিস নেওয়া নিষিদ্ধ। আমার সময় ইমিগ্রেশনে মালয়েশিয়ান ভিসা দেখে অনেক ঝামেলা করেছিল। তারা বলছিল যে প্রবাসী কল্যাণ সমিতির কার্ড ছাড়া চাকরির ভিসায় যেতে দিবেনা। পরে জেদ করার কারণে তাদের একজন সিনিয়র অফিসার এসে আমাকে ছাড়িয়ে দিলেন। উনি বললেন যে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার এদের জন্য কার্ডের প্রয়োজন নেই। সুতরাং এমন হয়রানি করা হলে মাথা ঠান্ডা রেখে ডীল করুন। আল্লাহ ভরসা। ইমিগ্রেশন পার হয়ে লাউঞ্জে বসে সময় কাটাতে পারেন। আপনার ফ্লাইট কোন গেট দিয়ে যেতে হবে সেটা বোর্ডিং পাস থেকে জেনে নিন। কিছু গেট পর্যন্ত যেতে ১০ মিনিট হাঁটতে হয়। সুতরাং আগে থেকে প্রিপারেশন রাখুন।

আর ফ্লাইটের সময় হালকা জামাকাপড় পড়তে পারেন, সাথে পাতলা সোয়েটার বা চাদর জাতীয় কাপড় নিতে পারেন কারণ ঘন্টাখানেক পর ঠান্ডা লাগতে পারে। ফ্লাইট চলাকালে বেশী করে পানি খাওয়া ভাল। তাতে ডিহাইড্রেশন হবেনা। বিশেষত বিমানের শুষ্ক বাতাসে অনেকের নাকে ও কানে সমস্যা হয়। পানি খেলে এমন পরিস্থিতি এভয়েড করা সম্ভব। ঢাকা টু কুয়ালালুমপুর ফ্লাইট টাইম সাধারণত সাড়ে তিন থেকে চার ঘন্টা লম্বা হয়। এজন্য নোটবুক বা ফোনে দুতিনটা মুভি, অডিওবুক রাখতে পারেন। নিতে পারেন প্রিয় কোন বইও। এতে বোরিং লাগবেনা। চাইলে দুতিন ঘন্টার ঘুমও দিয়ে দিতে পারেন। তাহলে জেট ল্যাগ কাটানো সহজ হবে। সেই সাথে নেমেই ফ্রেশ লাগবে। ফ্লাইট থেকে নামার আগে ফোনের ডেট/টাইম সেটিংস থেকে টাইমজোন বদলে Asia/KualaLumpur বা GMT+8 করে নিন।

মালয়েশিয়ান ইমিগ্রেশনের প্রস্তুতি

এই টপিকের জন্য আলাদা একটা পোস্ট লেখা উচিত ছিল। তবুও সংক্ষেপে বর্ণনা করব। কুয়ালালুমপুর এয়ারপোর্ট আসলে পাশাপাশি ২টা এয়ারপোর্ট মিলে তৈরী। বাংলাদেশী কম পপুলার এয়ারলাইন্সগুলা সাধারণত KLIA2 তে ল্যান্ড করে। মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্স এরা ল্যান্ড করে KLIA তে। দুই এয়ারপোর্টের মাঝে অটোমেটিক ইলেকট্রিক ট্রেন দিয়ে ফ্রিতে যাতায়াত করা যায়। যদি আপনি KLIA তে নামেন, তাহলে ইমিগ্রেশন অফিস কাছেই পাবেন। যদি KLIA2 তে নামেন, তাহলে ট্রেনে করে ২ মিনিটে KLIA তে আসতে হবে। প্রয়োজনে লিফটে করে নিচের ফ্লোরে যাওয়া লাগতে পারে।

মালয়েশিয়ায় ঢুকতে হলে আপনাকে ইমিগ্রেশন পার হতে হবে। আগেই বলে রাখছি এই স্টেপটা বেশ যন্ত্রণাদায়ক। কিন্তু মাথা ঠান্ডা রেখে কাজ করলে আল্লাহর রহমতে কোন সমস্যা হবেনা। ইমিগ্রেশনের আগে কিছু কাজ করে নিন তাহলে উপকার হবে।

কেনাকাটা শেষে একটু বিশ্রাম নিয়ে নিতে পারেন। ওয়াশরুমের কাজ থাকলে সেরে নিন কেননা ইমিগ্রেশন স্টেপটা বেশ লম্বা ও সময় সাপেক্ষ।

মালয়েশিয়ান ইমিগ্রেশন

অনেকের ধারণা থাকতে পারে যে ভ্যালিড মালয়েশিয়ান ভিসা থাকার পরেও কেন ইমিগ্রেশনে ঝামেলা হতে পারে। তাদের জন্য বলছি, ঢাকায় অবস্থিত মালয়েশিয়ান এমব্যাসি শুধুমাত্র ট্রাভেল পাস দিতে পারে। মাল্টি এনট্রি ভিসা আসলে মালয়েশিয়া এসে এখানকার ইমিগ্রেশন অফিস থেকে পাসপোর্টে স্ট্যাম্পিং করে নিতে হয়। এজন্য আপনি এমপ্লয়মেন্ট পাস নিয়ে গেলেও আপনাকে ইমিগ্রেশন ডিপার্টমেন্ট আটকাতে পারে। তবে যথাযথ চেকিং করার পর ছেড়ে দেয়। কাজেই ভয় পাওয়ার কিছু নেই।

বিমান থেকে নেমে দরকারী কাজ সেরে ইমিগ্রেশন কাউন্টারে চলে আসুন। এটা একটা বিশাল হলরুমের মত, পাশাপাশি প্রায় ৫০টা কাউন্টার। কোন কাউন্টারে কোন পাসপোর্ট নিয়ে দাঁড়াতে হবে তা লেখা থাকে। লাইন ধরে দাঁড়িয়ে যান। প্রতিটা ইমিগ্রেশন কাউন্টারের সামনে হলুদ লাইন দেওয়া থাকে। হলুদ লাইনের আগে কেও আসলে ইমিগ্রেশন পুলিশ ঝামেলা করতে পারে। কাজেই তাড়াহুড়া না করে ধীরে সুস্থে লাইনে দাঁড়ান। যখন আপনার সামনের জন পাসপোর্ট পেয়ে বেরিয়ে যাবে, তখন ইমিগ্রেশন পুলিশ ডাকলে আপনি সামনে যাবেন।

আপনার ভাগ্য ভাল হলে ইমিগ্রেশন পুলিশআপনার এমপ্লয়মেন্ট পাস-ওয়ালা সিংগেল এন্ট্রি ভিসা দেখেই ছেড়ে দিবে। তবে অনেক সময় (ইচ্ছা করেও হয়ত) তারা EP এর বিষয়টা বুঝেনা। তারা ট্রাভেল ভিসা মনে করে রিটার্ন টিকেট দেখতে চায়। সেক্ষেত্রে আপনাকে স্পেশাল ইমিগ্রেশন রুমে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। অনেকের কাছেই এটা ছোটখাট হরর মুভির মত এক্সপেরিয়েন্স হবে। তবে বলছি, ঘাবড়াবেন না।

স্পেশাল ইমিগ্রেশন রুমটা বেশ ছোট, তবে এখানে বেশ কয়েকজন পুলিশ থাকে। সাধারণত জাল ভিসা, সন্দেহজনক ট্রাভেলার দেখলে তাদেরকে এই রুমে আনা হয়। আর এই রুমের পুলিশরাও সকলের সাথে একটু রাফ আচরণ করতে পারে। কয়েকটা টিপস দিচ্ছি, তাহলে আপনাকে কোনরকম ঝামেলা ছাড়াই রিলিজ করে দিবে।

ইমিগ্রেশন পুলিশের সামনে কনফিডেন্ট থাকলে এবং যা প্রশ্ন করা হয়েছে তা ঠিকমত ইংরেজীতে উত্তর দিলে কোনরকম সমস্যা হবেনা ইনশাআল্লাহ। ইমিগ্রেশন শেষে আপনি আবার আগের কাউন্টারে ফিরে যান। তখন তারা আপনাকে সহজেই যেতে দিবে। সব শেষে আপনি চলে আসবেন লাগেজ কালেক্ট করার হলে। এখানে কনভেয়ার বেল্টে সবার লাগেজ চলে আসে। ইমিগ্রেশনে কয়েক ঘন্টা দেরী হয় বলে অনেক সময় আপনার ব্যাগ কনভেয়ার বেল্ট থেকে নামিয়ে অন্য জায়গায় জড়ো করা থাকতে পারে। একটু খুঁজে দেখলেই পেয়ে যাবেন।

লাগেজ কালেক্ট করা শেষে আপনার কাজ হল এয়ারপোর্ট থেকে বের হওয়া। এখান থেকে গ্র্যাব ভাড়া করে কিংবা KLIA Ekspress এর ট্রেনে করে অথবা বাসে করে কুয়ালালুমপুর চলে আসতে পারেন। মূল শহর থেকে এয়ারপোর্ট প্রায় ৫০-৬০ কিমি দূরে। ট্রেনে করে যেতে ৩০-৪৫ মিনিট আর গাড়িতে/বাসে করে গেলে ১-২ ঘন্টা লাগবে। কাজেই আবারো বলছি, পর্যাপ্ত পানি ও খাবার কিনে (বা খেয়ে) নিন।

আশা করি আপনারা ভালমতই ইমিগ্রেশন পার হয়ে যেতে পারবেন। এয়ারপোর্টের ঝামেলা শেষ করে চলে যান হোটেলে বা আত্মীয়ের বাসায় বা নিজের বাসায় (যদি রেন্ট নেওয়া হয়ে থাকে)। বাকি পর্বে টুকটাক মালয়েশিয়ান লাইফস্টাইল টিপস নিয়ে লিখব ইনশাআল্লাহ। শুভকামনা সবার জন্য।